
মতামত: ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক আশ্রয় ও অপরাধের ঝুঁকি—দায় এড়াবে কে?
লেখক: মো. কামাল হোসাইন
বিভাগ: মতামত | আমাদের মুন্সিগঞ্জ
একটি শিশুর হাতে বই থাকার কথা, থাকার কথা স্বপ্ন দেখার সাহস। কিন্তু সেই হাতেই যখন একসময় অপরাধের হাতিয়ার উঠে আসে, তখন শুধু ওই তরুণকে দায়ী করলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? প্রশ্নটি আরও গভীর। কেন একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পথ ছেড়ে দেয়? কেন কিছু তরুণ অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়? আর কেন রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের আশ্রয় পাওয়ার ধারণা তাদের কারও কারও কাছে অপরাধের ঝুঁকি নেওয়াকে সহজ করে তোলে?
মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় এসব প্রশ্ন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া মানেই কেউ অপরাধী নয়। অনেক শিক্ষার্থী দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, কর্মসংস্থানের অভাব কিংবা অন্যান্য প্রতিকূলতার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। তাদের অনেকেই সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করে পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব পালন করে। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন শিক্ষার বাইরে চলে যাওয়া কোনো তরুণকে অপরাধী চক্র, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সহিংস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথে ঠেলে দেওয়া হয়।
শিক্ষার বাইরে চলে গেলে সামনে কী থাকে?
একজন শিক্ষার্থী যখন স্কুল ছেড়ে দেয়, তখন তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকের দিকনির্দেশনা, সহপাঠীদের সঙ্গে সুস্থ যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ গড়ার পরিকল্পনা—এসব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেউ কেউ অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। পরিবারের আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, হতাশা এবং সামাজিক অবহেলা সেই অনিশ্চয়তা আরও বাড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ। কিন্তু সমাজ যদি এসব সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, আর কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী যদি সহজ অর্থ, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার প্রলোভন দেখায়, তাহলে কিছু তরুণ ভুল পথে আকৃষ্ট হতে পারে।
তবে এখানে সতর্ক থাকা জরুরি: অপরাধের কারণ একমাত্র শিক্ষাছুট নয়। পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক বৈষম্য, অপরাধী নেটওয়ার্ক, মাদক, স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতাসহ একাধিক বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজনৈতিক পরিচয় কি অপরাধের ঢাল হয়ে উঠছে?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবকে ব্যবহার করে অপরাধের অভিযোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়—এমন অভিযোগ সমাজে আলোচনায় আসে। যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, মারামারি, মাদক ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িয়েও জবাবদিহির বাইরে থাকার সুযোগ পায়, তাহলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনীতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, জনসেবা এবং সমাজের উন্নয়নের মাধ্যম হওয়া উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় যদি কারও কাছে অন্যায় করার সাহস জোগায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, তরুণ প্রজন্ম এবং রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা।
কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সব কর্মীকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা যেমন অন্যায়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপরাধের অভিযোগকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষভাবে, প্রমাণের ভিত্তিতে। অপরাধ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনতে হবে।
শুধু শাস্তি নয়, প্রতিরোধও জরুরি
অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, কিন্তু তার আগেই ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের পাশে দাঁড়ানো আরও কার্যকর হতে পারে। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামাজিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রথমত, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে তাদের পড়াশোনায় ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে। যারা প্রথাগত শিক্ষায় ফিরতে পারবে না, তাদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মাধ্যমে তরুণদের ইতিবাচক সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শুধু রাজনৈতিক মিছিল বা দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত করাই তরুণদের সম্পৃক্ত করার একমাত্র পথ হতে পারে না।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে—কোনো অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দলীয় পরিচয়ের কারণে সুরক্ষা দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে অভিযোগের নামে কাউকে হয়রানি করাও চলবে না। নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, অভিভাবক, শিক্ষক এবং স্থানীয় সমাজকে তরুণদের আচরণে বিপজ্জনক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। অপমান, ভয় দেখানো কিংবা সামাজিকভাবে একঘরে করার পরিবর্তে কাউন্সেলিং, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
মুন্সিগঞ্জের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
মুন্সিগঞ্জের তরুণেরা দেশের ভেতরে ও বিদেশে শ্রম, মেধা এবং দক্ষতা দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন। তাদের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ। একটি তরুণ যেন মনে না করে—শিক্ষা বা বৈধ কাজের মাধ্যমে এগোনোর চেয়ে প্রভাবশালী কারও ছত্রচ্ছায়ায় থাকা সহজ।
স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কোথায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, কী কারণে ঝরে পড়ছে, কোন এলাকায় তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট বেশি এবং অপরাধ প্রতিরোধে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন তরুণের অপরাধে জড়িয়ে পড়া শুধু তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; অনেক সময় এটি আমাদের সামাজিক প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। তবে তার দায় নির্ধারণ করতে হবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে, অনুমানের ভিত্তিতে নয়।
শেষ কথা হলো, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা নয়—তাদের শিক্ষায়, দক্ষতায় ও কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। আর যারা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অপরাধ করে বা অপরাধীদের সুরক্ষা দেয়, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের হাতে বই, দক্ষতা ও কাজের সুযোগ তুলে দিতে পারলে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে মুন্সিগঞ্জের ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় হতে পারে।
