স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই বিদেশযাত্রা: মুন্সিগঞ্জের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময় কি আসেনি?

স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই বিদেশযাত্রা: মুন্সিগঞ্জের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময় কি আসেনি?

মতামত | আমাদের মুন্সিগঞ্জ

একটি শিশুর হাতে যখন বই থাকার কথা, তখন তার চোখে যদি জীবিকার সন্ধানে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভর করে, তখন বিষয়টি শুধু একটি পরিবারের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে আমাদের শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন পরিবারে বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী আয় বহু পরিবারের আর্থিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি কোনো শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষাও শেষ করার আগেই জীবিকার আশায় বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবে, কিংবা পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ এবং জেলার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

শিক্ষার চেয়ে জীবিকার তাগিদ বড় হয়ে উঠছে কেন?

একটি পরিবারের কাছে যখন দ্রুত আয় করা সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়ায়, তখন দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার গুরুত্ব অনেক সময় কমে যায়। বিদেশে থাকা আত্মীয়ের সাফল্য, পরিবারের আর্থিক সংকট, সামাজিক প্রত্যাশা এবং অল্প সময়ে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সব পরিবারের বাস্তবতা এক নয়। কেউ দারিদ্র্যের কারণে, কেউ উন্নত জীবনের আশায়, আবার কেউ পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের জন্য এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই সমস্যাটিকে শুধু অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব হিসেবে দেখলে চলবে না। কেন একটি শিশু বা কিশোর মনে করছে যে শিক্ষার চেয়ে দ্রুত বিদেশে যাওয়া তার জন্য বেশি জরুরি, সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে।

আমাদের দেখতে হবে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার জন্য কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, ঝরে পড়ার পেছনে আর্থিক চাপ কতটা ভূমিকা রাখছে এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পর তাদের সামনে কী ধরনের বাস্তব সুযোগ রয়েছে।

আজকের সিদ্ধান্ত, আগামী দিনের প্রভাব

স্কুলের শিক্ষা একজন মানুষের ভবিষ্যৎ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই পর্যায়ে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতাভিত্তিক পেশায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে বিদেশে গিয়ে যারা অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমে যুক্ত হয়, তাদের জন্য ভালো কর্মসংস্থান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ অর্জন করা কঠিন হতে পারে।

বিদেশে কাজ করা অসম্মানের কিছু নয়। বরং প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান আমাদের অর্থনীতি ও পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা, দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান এবং বৈধ অভিবাসনসংক্রান্ত প্রস্তুতি ছাড়া বিদেশে যাত্রা একজন তরুণকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে।

এখানে প্রশ্ন বিদেশে যাওয়া উচিত কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষার্থী কি নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য, প্রস্তুতি ও বিকল্প হাতে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে?

মুন্সিগঞ্জের ভবিষ্যৎ কোথায়?

একটি জেলার উন্নয়ন শুধু সড়ক, সেতু, ভবন কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হলো শিক্ষিত, দক্ষ, সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী জনগোষ্ঠী।

যদি শিক্ষার্থীরা অল্প বয়সে বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে জেলার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে স্থানীয় ব্যবসা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, শিল্প, কৃষি ও উদ্যোক্তা খাতে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে, যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে যাওয়া তরুণেরা আরও ভালো কাজের সুযোগ পেতে পারে, বেশি আয় করতে পারে এবং দেশে ফিরে ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগের মাধ্যমে অবদান রাখতে পারে। তাই শিক্ষাকে বিদেশযাত্রার বাধা হিসেবে নয়, বরং নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এখনই কী করা প্রয়োজন?

প্রথমত, মুন্সিগঞ্জের কোন কোন এলাকায় শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। কারণ সমস্যার প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি না জেনে কার্যকর সমাধান তৈরি করা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারগুলোর জন্য বৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ, উপযুক্ত পরামর্শ এবং প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তার সুযোগ বাড়াতে হবে। বিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে সহায়তা করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার পরামর্শ, কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং বৈধ অভিবাসন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। যারা বিদেশে যেতে চায়, তাদেরও বুঝতে হবে—শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন বিদেশে ভালো কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

চতুর্থত, প্রবাসী মুন্সিগঞ্জবাসীদের সম্পৃক্ত করে শিক্ষাবৃত্তি, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যাঁরা বিদেশে গিয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের জন্য মূল্যবান হতে পারে।

আমরা কি নতুন করে ভাবব না?

মুন্সিগঞ্জের কোনো শিশু যেন শুধু পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে নিজের শিক্ষা ও সম্ভাবনাকে অকালেই সীমিত করে ফেলতে বাধ্য না হয়—এটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

একটি শিশু স্কুল শেষ করার আগেই জীবিকার চিন্তায় পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চাইলে তাকে শুধু বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা থেকে বিরত রাখলেই হবে না। তার সামনে এমন একটি বাস্তব ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ আছে এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্মানজনক জীবন গড়ার পথ খোলা রয়েছে।

মুন্সিগঞ্জের তরুণেরা বিদেশে যাক, বিশ্বকে জানুক, দক্ষতা অর্জন করুক—এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু তাদের যাত্রা যেন বাধ্যবাধকতা থেকে নয়, প্রস্তুতি ও সচেতন সিদ্ধান্ত থেকে আসে।

মুন্সিগঞ্জের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্নটি তাই শুধু বিদেশমুখী তরুণদের নিয়ে নয়; এটি এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রশ্ন, যারা শিক্ষা, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নিতে পারবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top